100 Years of Kolkata Radio | শতবর্ষে কলকাতা বেতার
Share
কলকাতা বেতার: শতবর্ষের ঐতিহ্য
ভারতের সম্প্রচারের ইতিহাসে প্রযুক্তিবিদ্যার বৈজ্ঞানিক সাফল্যের অগ্রগতির নিত্যনতুন পথের দিশারি হলেও, ‘কলকাতা বেতার’ তার যাত্রার সূচনা পর্বে তার বিজয়রথে যে ঐতিহ্য ও গৌরবের পতাকা উড়িয়েছিল, আজ শতবর্ষের অতিক্রান্ত পথে সমানভাবেই উড্ডীন। চলমান সম্প্রচারের সকল বিরুদ্ধতাকে সহজে জয় করে বাংলা ও বাঙালির হৃদয়ে আজও সমাসীন। বেতার তরঙ্গের ঘটনা পরম্পরায় জানা যায়, ১৮৯৫ সালে ভারতগৌরব বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ঔপনিবেশিক কলকাতায় বেতার তরঙ্গের পরীক্ষা করেন।

১৯১২-তে মারকোনি কোম্পানি কলকাতায় বসে, সমুদ্রপথের চলাচলের জাহাজের সঙ্গে বেতার সংযোগের ব্যবস্থা করে। এরপর সাল ১৯২৩। নভেম্বর মাস। ঘটে গেল সেই অঘটন। ক্যালকাটা রেডিও ক্লাব-এর মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে বেতার অনুষ্ঠান শুরু হয়। তার ঠিক দু-টি বছর পর ১৯২৫-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিজ্ঞানশাখার’ অধ্যাপক শিশিরকুমার মিত্র পরীক্ষামূলকভাবেই বেতার সম্প্রচারে নিয়ে গবেষণা শেষে ট্রান্সমিটার বসিয়ে তিনি কথিকা, গান ও কবিতা পাঠ—সম্প্রচার করেন ও কৃতকার্য হন।
১৯২৬, গড়ে উঠল I.B.C বা ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি ১৯২৬ থেকে ২৭ কলকাতায় বেতারকে বাণিজ্যিক সম্প্রচারের চেষ্টার শুরু করা হয়। কাশীপুরের কাছে টালা পার্ক ট্রান্সমিটার স্থাপন এবং গাস্টিন প্লেসে স্টুডিও বা সম্প্রচার কেন্দ্র করা হয়। ইতিহাস বলছে ২৬ আগস্ট ১৯২৭ বেতারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এইদিনই ছিল গার্স্টিন প্লেস থেকে ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানির কলকাতা কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার। সেই সূত্রেই ২৬ আগস্ট কলকাতা বেতারের জন্মদিন হিসেবে পালিত হচ্ছে।

গান থেকে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, যন্ত্রসংগীত থেকে শিশুমন বিকাশে ছোটোদেরও অনুষ্ঠান, নাটক থেকে খেলাধূলার ধারাভাষ্য প্রায় সকল শ্রোতারই মনের দরজায় পৌঁছোবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ক্রমাগত পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে অনুষ্ঠান প্রচারের সাফল্যের নিরিখে নিয়মিত সম্প্রচারে। এলো ১৯২৯ সাল থেকে ‘কলেজ পড়ুয়াদের অনুষ্ঠান (Students Hour), শিশুদের অনুষ্ঠান (Children Corner) মহিলা মজলিস (Ladies Corner) এবং সঙ্গীত শিক্ষার আসর—বলা বাহুল্য নাম শুনেই বোঝা যায়, গান শেখাবার বিশেষ অনুষ্ঠান। যা পঙ্কজকুমার মল্লিকের সময় খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।
এলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। আকাশবাণী বা কলকাতা বেতারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী নাম—বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। স্বনাম ও ছদ্মনামে অনেক অনুষ্ঠান করেছিলেন যার প্রতিটিই ছিল শ্রোতাদের অত্যন্ত ভালো লাগার। বিশেষ করে সবিনয় নিবেদন, মহিলা মজলিস (পরে মহিলা মহল) লাউড স্পিকার অনুষ্ঠানগুলি ছিল শ্রোতাদের মনকাড়া।

অন্যদিকে একেবারে কচি কাচাদের জন্য ‘গল্পদাদা’ নামে যোগেশচন্দ্র বসু করতেন ‘ছোটোদের বৈঠক’।১৯৩০ সালের পর, ১৯৩২ থেকেই পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীনে চলে আসে বেতার। আর ১৯৩৬-এর নাম—All India Radio হলোনিয়মিত অনুষ্ঠান চলাকালীন, ১৯৪১ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর সময়, কলকাতা বেতার থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার সংবাদ সম্প্রচার হত। যদিও ১৯৩৯ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন পুরীতে তখনই তাঁর গান আবৃত্তি রেকর্ডিং করা হয়েছিল।
১৯২৮ থেকে কাজি নজরুল ইসলামও বেতারের সঙ্গে জড়িয়ে পরলেন। তাঁর গান, কবিতা, সংগীত চিন্তা বেতারের প্রথম দিনের সমৃদ্ধশালী অনুষ্ঠান হিসাবে পরিচিত ছিল।সংগীত সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি ‘সংবাদ’-এর ভূমিকাও গুরুত্ব সহকারে সম্প্রচারিত হয়েছিল বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতের স্বাধীনতালাভের রাতটি বেতারেরও ঐতিহাসিক রাত। মধ্যরাতে সর্বত্র সম্প্রচারিত হল জওহরলাল নেহরুর, ঐতিহাসিক ভাষণ—‘Tryst with Destiny’তারপর থেকেই আঞ্চলিক সংবাদের গুরুত্ব বাড়ল কলকাতা কেন্দ্রের—১৯৫৫ শুরু হল—Regional News Unit বা আঞ্চলিক সংবাদ বিভাগ।
পরবর্তীকালে অনুষ্ঠানের শীর্ষদেশে ছিল, বছরে একবার সম্প্রচার হলেও আকাশবাণীর তিন মহারথীর—বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, বাণীকুমার ও পঙ্কজ মল্লিক-এর আগমনীর আহ্বানে মহিষাসুর মর্দিনী।
একটি ছোট Radio Timeline
- ১৮৯৫ — জগদীশচন্দ্র বসুর বেতার তরঙ্গের পরীক্ষামূলক প্রদর্শন
- ১৯১২ — কলকাতায় Marconi Company-এর অফিস
- ১৯২৩ — কলকাতা Radio Club-এর সম্প্রচার
- ১৯২৫ — শিশিরকুমার মিত্রের পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
- ১৯২৭ — Indian Broadcasting Company-এর কলকাতা কেন্দ্র
- ২৬ আগস্ট ১৯২৭ — কলকাতা বেতারের আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার শুরু
- ১৯২৯ — Children's Corner, Students' Hour, মহিলা মজলিশ ইত্যাদি
- ১৯৩০ — সরকারি নিয়ন্ত্রণে Indian State Broadcasting Service
- ১৯৩২ — সরকারি বেতার পরিষেবা স্থায়ীভাবে চালু
- ১৯৩৬ — All India Radio-এর প্রতিষ্ঠা
- ১৯৪১ — রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুকে ঘিরে বিশেষ বেতার সম্প্রচার
- ১৯৪৭ — স্বাধীনতার ঐতিহাসিক মুহূর্তে কলকাতা বেতারের সম্প্রচার
- ১৯৫৫ — Regional News Unit স্থাপনা
- ১৯৫৭ — 'আকাশবাণী' নামের সরকারি স্বীকৃতি
- ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ — Garstin Place থেকে Akashvani Bhavan-এ স্থানান্তর
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, পল্লিকথা থেকে মহিলা মহল, অনুরোধ আসর, শুক্রবারের নাটক ছাড়াও প্রণবেশ সেনের ‘সংবাদ পরিক্রমা’ আজও মনে জাগে। শতবর্ষের কলকাতা বেতারকে জানতে সাহিত্য সংসদ থেকে প্রকাশিত আকাশবাণীর নাট্য প্রযোজক জগন্নাথ বসু-র ‘বেতারের গ্রিনরুম’ ও আকাশবাণীর সংবাদ থেকে বার্তা সম্পাদক ভবেশ দাসের ‘কলকাতা বেতারের দশ ব্যক্তিত্ব’-র পাতায় ছড়িয়ে আছে শতবর্ষের কলকাতা বেতারের অজানা গল্প।